সব
ঢাকা Translate Bangla Font Problem

“আমাদের গৌরব” বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান

AUTHOR: Amarbangla Desk
POSTED: Monday 12th December 2016at 7:02 pm
195 Views

34মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জলঃ  (১৬ই ডিসেম্বর উপলক্ষ্যে ) ঝিনাইদহে মহেশপুর উপজেলার এস বি কে ইউনিয়নের খর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মেছিলেন আমাদের গৌরব বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান।

শৈশব, পাখির ডাক আর মোয়াজ্জিনের আযান শুনে যে গাঁয়ের মানুষের ভাঙ্গে । তেমনি এক গাঁেয়র ভূমিহীন আক্কাস আলী মন্ডল । একেবারেই সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত। স্বপ্ন নেই তেমন একটা। কায়ক্লেশে জীবন চলে তার। সেই আক্কাস আলীর ঘরেই জন্ম নেই তার প্রথম সন্তান হামিদুর রহমান। ছেলেকে ডাকলেন হামিদুর বলে। প্রতিবেশীদের কাছেও শিশু
হামিদুর আদরের হামিদুর হয়ে গেলেন। হবেই না কেন? চটপটে এই ছেলেটির দিকে চোখ নিলে যে কারো মায়া না লেগে পারে না।

মা-বাবা প্রতিবেশী নিকটজনের আদরে আদরে হামিদুর বড় হতে থাকে। বয়স হয় পড়শোনা করার। তিনি ইচ্ছ প্রকাশ করেন লেখাপড়া করার। প্রতিবেশীরা বলেন আক্কাস তোমার ছেলেটাকে অন্তত পাঠশালায় দাও। আক্কাস আলীর ও তেমনি ইচ্ছা ছিল। তাই তিনি প্রতিবেশীদের কথায় সম্মত হন। ভাবে ছেলেটারও যখন ইচ্ছা আছে, দেখা যাক না চেষ্টা করে। পিতা আক্কাস আলী মন্ডল স্থানীয় পাঠশালায় ভর্তি করিয়ে দেন তাকে।

পাঠশালার পরিবেশের সাথে দারুন সখ্য গড়ে ওঠে হামিদুরের। অনেক বন্ধু বান্ধব জুটে যায় তার। নতুন কিছু শেখার সুযোগ আছে এখানে। শেখার দিকে তার আকর্ষন বাড়ে। সেই আকর্ষনই তাকে মেধাবী ছাত্র হতে সাহায্য করে। তিনি এবার শিক্ষক শিক্ষিকাকেও আকৃষ্ট করেন। দেখতে দেখতে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ শেষ করেন।

তার ইচ্ছা তিনি ভর্তি হবেন উচ্চ বিদ্যালয়ে । বাবা আক্কাস আলীও তাই চাইছিলেন, যেহেতু লেখাপড়ায় ভাল তাই তার উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু সাধ আর সাধ্য যে এক নয় আক্কাস আলীর । অবশেষে সাধ্যের কাছে হার মেনে যায় আক্কাস আলী ও হামিদুরের সাধ। হামিদুর তারপরও লেখাপড়া ছাড়তে চাননি। ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হলেন এক নৈশ বিদ্যালয়ে । কিন্তু যে পরিবারের খাবার জোটেনা ঠিকমত তাদের পক্ষে কি একটি ছেলের লেখাপাড়ার ব্যয় বহন করা সম্ভব ? তাই লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে ফেলতে হয় ওখানেই। অভাবের সংসারে বাবার সহায়তায় এগিয়ে আসতে হয় হামিদুরকে। নিজের জমি জিরেত নেই কিছুই। তাই কাজ করতে হয় অন্যের জমিতে । হাল বেয়ে বীজ বুনে কিংবা জমিতে নিড়ানী দেওয়া মত হরেক রকম কাজ করে তাদের দিন যায়। এখানেও হামিদুর অনন্য হিসাবে গন্য হলেন। মনোযোগী ও আন্তরিক হওয়ার কারনে কাজ করার জন্য গ্রামের মানুষ হামিদুর কে ডেকে নেয় সবার আগে। আক্কাস আলী মন্ডলকে গৃহস্তরা বলতেন কাজের সময় হামিদুর কে নিয়ে এসো। কারন সে কাজে আন্তরিক ও দক্ষ। কিন্তু তাতেও কি সংসারের টানা পড়েন কাটে? গরীবের ছেলে হামিদুরকে সাবাই ভালবাসে। সেই ভালবাসার টানেই তিনি প্রতিবেশীদের সম্ভাব্য যে কোন কাজেই সহযোগীতা করতেন। শত দারিদ্রের মাঝেও নিজেকে অপরিহার্য করে তুলতে সক্ষম হন গোটা
গ্রামে। আর হবেনই না কেন কেউ মারা গেলে ডাক পড়ে হামিদুরের ।

শেষ গোসল করানো, লাশ কাঁধে নেয়া,লাশ ধোয়ানো, কবর খোড়া সব কাজেই এগিয়ে যেতেন হামিদুর রহমান। কৈশরেই ছিলো হামিদুরের পেটানো শরীর । শক্তিমত্তা ছিল আসাধারন । একাই তিনি একটি কবর খনন করতে পারতেন। এখনো গ্রামের মানুষ তার কর্মস্পৃহা, আন্তরিকতা নিয়ে আলোচনা করে। অন্যান্য সামাজিক কাজেও তিনি ছিলেন মধ্যমণি। আপদে বিপদে তিনি সবার পাশে দাড়াতেন। এজন্যই এই কিশোরকে খুব ভালবাসতেন গ্রামের মানুষ।

একটি গ্রামের মানুষের ভালবাসা পেয়ে যে শিশুটি ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করেছিল, সেই শিশুটিই একসময় গোটা জাতির ভালবাসায় শিক্ত হবে, এমন ধারনা কেউ হয়ত করেনি। নিকট জন কিংবা প্রতিবেশীদের কেউ কেউ হয়ত এমনটা চিন্তা করতে পারে যে, ছেলেটি তার বাবা-মায়ের মত সাদাসিধে গোছের কেউ হবে।

গ্রামের মানুষের সঙ্গে সদভাব রাখতে পারবে বোঝা যায় তার শৈশবেই। কিন্তু সেই ছেলেটিই যখন ইতিহাসের অনন্য উপাদান হিসাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হলো এবং সেই ছেলেই যখন গোটা জাতির স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎস্বর্গ করে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব লাভ করতে সক্ষম হলো তখন তাদের গর্ব আর ধরেনা। হামিদুরের কারণে আজকে
খর্দ্দ খালিশপুর গ্রাম সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছে।

হাজার হাজার বছর ধরে হামিদুরের বীরত্বগাথা মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হবে এবং খর্দ্দ খালিশপুরের নাম ও সমানভাবে উচ্চারিত হবে। সেই খর্দ্দ খালিশপুর যে হামিদুরেরই প্রতিবিম্ব ধারণ করে আছে গোটা বাংলাদেশ। বর্তমানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের নামে করা হয়েছে সরকারী বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ হামিদুর রহমান ডিগ্রী কলেজ। গত ২০০০সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি ২০১৩ সালে সরকারী করণ করা হয় । হামিদুর রহমানের বসত বাড়ীতে গড়া হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর। যা দেখতে দেশের সব প্রান্ত থেকে আমাদের গৌরব হামিদুর রহমান বসতবাড়ী ও স্মৃতি জাদুঘর দেখতে হাজার পর্যটক ভীড় জমায়। সদ্য তার নামেই কলেজ প্রাঙ্গণে ইকোপার্ক নির্মাণে উপজেলা প্রশাসন শুভ
উদ্বোধন করেন।

তার সৈনিক জীবনের শুরু ১৯৭১ সালের জানুয়ারীতে চৌগাছায় ইস্ট বেঙ্গর রেজিমেন্টের রিক্রুটিং টিম আসেন । এলাকায় মাইক দিয়ে প্রচার করা হয়,সেনা বাহিনীতে ভর্তিচ্ছুক যুবকেরা যেন চৌগাছায় এসে ভর্তিপরীক্ষার জন্য লাইনে দাড়ায়। সেখান থেকে যোগ্যদের বাছাই করা হবে সৈনিক হিসেবে । হামিদুর লাইনে দাড়ায় এমন সুন্দর পেটানো শরীরর আর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষিকতা রিক্রুটিং টিমের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়। প্রাথমিক শারিরী পরীক্ষা এবং সংক্ষিপ্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নেয়া হয় তার। এই পরীক্ষায় পাশ করতে হামিদুরের বিন্দু মাত্র অসুবিধা হয়নি। তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে রিক্রুট হিসেবে নিয়োজিত হন।

মুজাহিদ বাহিনীর অধিনায়ক জানাতে গিয়ে দ্বিধায় পড়েন তিনি। কিন্তু তার পরও জানাতে হয়। কিন্তু অধিনায়ক তার এই উন্নতি দেখে আশির্বাদ করেন, সাফল্য কামনা করে হাসিমুখে তাকে বিদায় জানান। হামিদুরের এই সাফল্যের কারণে তার খুশী হওয়ার কথাও জানান তিনি। হামিদুরের চাকুরীতে যোগদান স্থান চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার যাকে সংক্ষিপ্ত ভাবে বলা হয় ইবিআরসি।

হামিদুর মুজাহিদ ক্যাম্প থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসেন নিজ গ্রাম খর্দ্দ খালিশপুরে । পিতা মাতাকে বলেন তিনি সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়েছেন এবং মুজাহিদ বাহিনী থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ী এসেছেন তাকে সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণের জন্য যেতে হবে চট্টগ্রামে। মায়ের মন সায় দিচ্ছিল না। তিনি বললেন, ভালইতো ছিল মুজাহিদের চাকুরী । ছেলেতো বাড়ীর কাছেই থাকতে পারতো। মা কায়দাসুননেছা এত দুরে হামিদুরের যাওয়াটা পছন্দ করছিলেন না। সেনাবাহিনী চাকুরী সম্পর্কে তার স্বচ্ছ ধারণা ছিল না। কিন্তু নুরুজ্জামান মিয়া এবং গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গরা হামিদুরের মা ও বাবাকে বোঝান যে, সেনাবাহিনীর চাকুরী মুজাহিদের চাকুরীথেকে অনেক ভাল এবং চাকুরীতে সম্মান সুযোগ সুবিধা অনেক বেশি। তারা আরো বোঝান যে, হামিদুর নিশ্চয়ই একজন বড় মাপের সৈনিক হতে পারবেন।

কারণ সে একজন শক্তিশালী সাহসী কিশোর এবং এরূপ কিশোরের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় গ্রামের সেই সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ বানীই সত্যে রূপান্তরিত হয়েছে। জাতির বুকে অসাধারণ ইতিহাস রচনা করতে সক্ষম হয়েছেন খর্দ্ধ খালিশপুরের সেই কিশোরটি। গ্রামের বিজ্ঞ জনের পরামর্শ মেনে নিলেন হামিদুরের মা এবং বাবা রাজী হলের ছেলেকে চট্টগ্রামে পাঠাতে । কিন্তু তার আগে ছেলে যাতে বিয়ে করে তার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। হামিদুরের মা সেই এলাকার সেসময় কম বয়সে ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেয়া হতো। হামিদুরের মা বললেন ছেলে চলে যাবে দুর দেশে তার আগেই ছেলেকে বিয়ে দিতে হবে। অথচ হামিদুরের বয়স তখন ষোল পেরিয়েছে মাত্র। হামিদুরের মা বললেন হামিদুর তার প্রথম সন্তান এবং তার পুত্রবধু আসলে হামিদুরের অনুপস্থিতি জনিত শূণ্যতা তেমন  ভাবে উপলব্ধি করবেন না।

হামিদুরের কথা চাকুরী তো হয়েছে এবার প্রয়োজন সংসারের আর্থিক সাচ্ছন্ধ্য ছোট ভাই বোনেদের মানুষ করার ব্যাপারটিও ভাবতে হবে। আর বিয়ের বয়স তো হয়নি এখনও। তিনি আরো জানালেন যে, সেনাবাহিনীর নিয়ম হিসেবে রিক্রুটদের বিয়ে করার অনুমতি নেই। প্রশিক্ষণ সম্পন্ধসঢ়;œ করলে বিয়ে করার অনুমতি পাওয়া যায়। নিয়মের পরিপন্থি কিছু করবেন না তিনি।

তিনি ফেব্রুয়ার মাসের প্রথম দিকে হামিদুর সবার কাছে বিদায় নিয়ে রওনা হন। চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে । মা বাবা ছেলের মাথায় হাত রেখে পরামর্শ দিলেন অনেক কিছু। ছেলের হাতে ধরিয়ে দিলেন একটি পুটলি। মা বললেন এর ভিতর কিছু শুকনো খাবার আছে। পথে ক্ষিদে লাগলে খেয়ে নিস। সব মায়ের মত হামিদুরের মাও বললেন বাইরের খাবার না খাওয়াই ভাল। ছেলের সুস্বাস্থ্য কামনা করলেন তারা। মায়ের চোখ ভরে গেল অশ্রু ভেজা চোখে। মা চেয়ে থাকে ছেলের যাওয়ার পথের দিকে। পেছনে তাকান হামিদুর । আবার চলতে শুরু করলেন সামনের দিকে । একরাশ আশা নিয়ে পৌছান চট্টগ্রাম। যোগদান করেন ইবিআরসিতে।

ইবিআর সিতে ভর্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন ২ ফেব্রুয়ারী ১৯৭১ সালে। অপেক্ষা করতে থাকেন প্রশিক্ষণের জন্য বহুল প্রতিক্ষিত সেই প্রশিক্ষণ শুরু হয় ফেব্রুয়ারী মাসের ৭ তারিখে। রিক্রুট হিসেবে তার বেতন ছিল ৭৮ টাকা প্রতি মাসে। তিনি ইবিআরসিতে এক মাস বেতন পেয়েছিলেন। প্রশিক্ষণের প্রথম থেকেই হামিদুর পূর্ণদমে কঠিন পরিশ্রম করা আরম্ভ করেন এবং প্রশিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন।

সেই হামিদুর খর্দ্ধ খালিশপুরের এক পল্লী কিশোর ৭১ এ হলের জাতীয় বীর। দেশ মাতৃকার স্বাধীনতার জন্য বিলিয়ে দিলেন নিজের জীবন। মরণ কে জয় করে তিনি হলেন ভাস্বর । স্বাধীন হলো বাংলাদেশ সেই দেশ সেই জনতা । তাকে সাদরের গ্রহণ করলো তিন যুগ পরে। আড়ম্বরপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তিনি শায়িত হলেন নিজ দেশে।

যারা একাত্তর দেখেনি তাদের কাছে একাত্তরের বার্তা নিে এলেন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর। তাদের কাছে হামিদুর হলেন অনুপ্রেরনা – আগামীতেও বাংলা মায়ের লক্ষ কোটি সন্তানের কাছে হামিদুর হবেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে শানিত এক মহাপ্রতীক। নিপীড়িত মানুষ জেগে ওঠার প্রেরনা লাভ করবে হামিদুরের কাছ থেকে। যিনি শুয়ে আছেন এই বাংলাদেশের মাটিতে- ঢাকার মিরপুর বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে. আমাদের গৌরব বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান।


সর্বশেষ খবর