সব
ঢাকা Translate Bangla Font Problem

কাশীতে ত্রৈলঙ্গ স্বামী ও বামাক্ষ্যাপার মহামিলন

AUTHOR: Amarbangla Desk
POSTED: Friday 10th April 2020at 1:11 pm
FILED AS: ধর্ম
53 Views

নড়াইল জেলা প্রতিনিধি : একবার বামাক্ষ্যাপা মায়ের কাছে গিয়ে কাশীধামের ”মা অন্নপূর্ণা” দর্শনের কথা জানালেন৷ মায়ের মনে ভয় হল কাশীর অন্নপূর্ণা দর্শনের পর যদি তাঁর আদরের বামা না ফেরে৷ তাই মা তারা বামাকে খুব করে বোঝালেন৷ হ্যাঁরে বামা তুই কাশী গেলে আমি কি করে থাকব ? আমার তো খুবই কষ্ট হবে৷ বামাক্ষ্যাপাও নাছোড়বান্দা কাশীধাম যাবেনই৷ উজ্জ্বল রায় নড়াইল জেলা প্রতিনিধি জানান, মা তারা বামাকে বললেন — “তুই কাশী যাসনা বামা, গেলে কষ্ট পাবি”৷ বামা বললেন কষ্ট পাইতো পাব মা! আমি কাশীধাম যাব৷

বামাক্ষ্যাপা মোক্ষদানন্দ আর ক্ষ্যাপার সব সময়ের সঙ্গী কালু কুকুর চললেন কাশীধাম৷ সঙ্গে গেলেন ক্ষ্যাপার সঙ্গী নন্দা দাই৷ কালু কুকুর প্রথমে, তারপর মোক্ষদানন্দ পরে বামাক্ষ্যাপা তারপরে নন্দা সারি দিয়ে যাচ্ছেন৷ কুঁজোপাড়ার ঘাটে নদী পেরিয়ে উদয়পুর ও দেখুড়িয়ার পথ ধরে রামপুরহাট ষ্টেশনের দিকে৷

রামপুরহাট তখন একটা বড়ো গ্রাম৷ ষ্টেশনে পৌচ্ছে ট্রেনধরে ভায়া অন্ডাল হয়ে তারা হাওড়া ষ্টেশনে পৌচ্ছাবেন৷ ট্রেন আসতে দেরি আছে — ক্ষ্যাপা ও মোক্ষদানন্দ গ্যাঁজা খেয়েছেন৷

ট্রেন এসেছে — সবাই মিলে ট্রেনে উঠে বসলেন৷ সে সময় ছিল বৃটিশদের রাজত্ব৷ ট্রেনের টিকিট বাবু এবং গার্ড সাহেবরা ছিলেন সাহেব৷ টিকিট বাবু টিকিট পরীক্ষা করতে এসেছেন৷ কিন্তু ক্ষ্যাপারাতো টিকিট কাটেননি৷

ক্ষ্যাপাকে টিকিটের কথা বলাতে ক্ষ্যাপা টুকিট ফুকিট নাই বাবা বলে বসে আছেন৷ ক্ষ্যাপাবাবা একেবারে ন্যাংটা থাকতেন এবং তারপর কুকুর নিয়ে যাচ্ছেন৷ ন্যাংটা হয়ে ট্রেনে ওঠা এবং কুকুর নিয়ে ওঠা নিষিদ্ধ ছিল৷

সবাইকে টিকিটবাবু সাঁইথিয়া ষ্টেশনে নামিয়ে দিয়েছেন৷ নামানোর পর, ট্রেন আর চলে না৷ ষ্টেশন মাষ্টার ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে গার্ড সাহেবকে নিয়ে অনেক পরীক্ষা করছেন কিছুতেই ট্রেন চলে না৷ কোন কিছু গোলমালও ইঞ্জিনে নেই৷

কথায় কথায় সেই কামড়ার লোকেরা বলা বলি করতে শুরু করেছে সাধুবাবাদের নামানোর জন্য ট্রেন চলছে না৷ এই কথা গুলো আস্তে আস্তে ষ্টেশন মাষ্টারের কানে পৌছালে — ষ্টেশন মাষ্টার প্লাটফর্মে দুরে চলে যাওয়া ক্ষ্যাপার দলকে জিজ্ঞাসা করে কোথায় যাবেন ? ক্ষ্যাপা বলেন কাশীধাম৷ আপনারা সবাই ট্রেনে উঠে বসেন৷

ট্রেনে উঠে ক্ষ্যাপা যেই বললেন “চলবাবা ট্রেন” — ওমনি ট্রেন আপনি চলতে লাগল৷ গার্ড সাহেব এবং টিকিটবাবু বুঝলেন এই সাধুবাবারা খুব বড়ো সাধক৷ যাইহোক এই ভাবে হাওড়া হয়ে ট্রেন ধরে কাশীধাম গিয়েছিলেন৷

কাশীর ট্রেনে ক্ষ্যাপাদের কিছু বেগ পেতে হয়নি — কারন লুপলাইনের ট্রেনের ড্রাইভার, গার্ড, টিকিটবাবুরা — কাশীর ট্রেনের কর্মীদের সব বলে দিয়েছেন৷

কাশীধাম পৌছে ক্ষ্যাপাবাবারা মনিকর্ণিকা ঘাটে স্নান করতে যাবেন৷ মোক্ষদানন্দ, নন্দা ক্লান্ত হয়ে এক গাছতলায় বিশ্রাম নিতে লাগলেন৷ ক্ষ্যাপা চলে গেলেন গঙ্গা ঘাটে৷ ওই ঘাটেই ক্ষ্যাপাবাবার সঙ্গে ত্রৈলঙ্গ স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল৷

ত্রৈলঙ্গ স্বামী মনিকর্ণিকা ঘাটে পদ্মাসনে গঙ্গায় ভেসে থাকতেন৷ সাধারন ভক্তরা ঘাটে স্নান সেরে ত্রৈলঙ্গ স্বামীর মাথায় বেলপাতা চাপাতেন এবং গঙ্গার জল মাথায় ঢালতেন৷ ত্রৈলঙ্গ স্বামীকে সেখানকার মানুষ সচল শিব বলে মানতেন৷

হঠাৎ ত্রৈলঙ্গ স্বামী ধ্যান ভেঙ্গে ভক্তদের বলছেন এই আমাকে একটা ”চির” দে৷

ভক্তরা তো অবাক ! বাবাজী হঠাৎ চির কি করবেন৷ যাইহোক ভক্তরা চির দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন — বাবাজী চির কি হবে ? বাবাজী বললেন — একটা মানুষ আসছে — পরিধান করবো৷

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ঘাটে ক্ষ্যাপা বাবা হাজির৷ ভক্তরা সেই মানুষ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে আছেন৷ ক্ষ্যাপার সঙ্গে সাক্ষাত হলো — দুই মহামানবের কথা হল আঙ্গুলে আঙ্গুলে৷

ত্রৈলঙ্গ স্বামী ক্ষ্যাপার উদ্দেশ্যে একটা আঙ্গুল তুলে উপরে দেখিয়ে ছিলেন৷ অর্থাৎ তোমার মতো এই মহান লোকের স্থান এই মর্তধাম নয় — তোমার স্থান উপরে৷

ক্ষ্যাপা বাবা প্রত্যুত্তরে জানিয়ে ছিলেন দুই আঙ্গুল অর্থাৎ তুমি এবং আমি জীব কল্যাণে এই মর্ত ধামেই ছদ্মবেশে থাকব৷ তারপর ক্ষ্যাপা স্নান করে সেই স্থান ত্যাগ করলেন৷

ভক্তরা এবারে ত্রৈলঙ্গ স্বামীকে প্রশ্ন করলেন বাবাজী আপনি যাঁর জন্য চির পরিধান করলেন সেইজনও তো নগ্ন — তিনি কে ? কোথায় থাকেন ?

ত্রৈলঙ্গ স্বামী উত্তরে জানিয়ে ছিলেন — “এই মহামানব চন্ডীপুর মহাশ্মশানের সিদ্ধ সাধক — ইনি এমন সাধনা করেছেন সে আমার বাবাকেও জিতেছেন”৷

ক্ষ্যাপাবাবা স্নান করে অন্নপূর্ণা মন্দিরে মাকে দর্শন করে পরমানন্দ লাভ করলেন৷ খুবই আনন্দে আছেন৷ কাশীর একটা বটবৃক্ষের তলায় আশ্রয় করেছেন৷ কিন্তু কোন খাদ্য নেই — কেউ খাবার দেয় নি৷ এই ভাবে কষ্টে সারাদিন ক্ষ্যাপা কাটালেন৷ ক্ষ্যাপা মনে মনে করছেন শুনেছিলাম কাশী অন্নপূর্ণা ধামে কেউ না খেয়ে থাকে না — তা কই আমাকে তো কেউ খাবার দিল না৷ আমার বড়মার দেশই ভাল৷

সেই সময় মা অন্নপূর্ণা নিজে এসে ক্ষ্যাপাকে ভোগ ও ফল খাইয়ে দিয়ে গেলেন৷ ক্ষ্যাপা ধন্য তুই অন্নপূর্ণা বলে নাম করতে লাগলেন। ক্ষ্যাপার ক্ষুধার কষ্ট দেখে স্বয়ং মা তারা, অন্নপূর্ণা রূপ ধরে ক্ষ্যাপাকে নিজে খাইয়ে গেলেন৷

রাত্রে ক্ষ্যাপার সঙ্গে আবার মোক্ষদানন্দ, নন্দা, কালু কুকুর সবার সঙ্গে সবার দেখা হল৷ একই সঙ্গে সবাই রাত্রি কাটিয়ে পরের দিন দুপুরে ট্রেন ধরে ফিরলেন৷

হাওড়ায় নেমে মোক্ষদানন্দ, নন্দা ফিরে এলেন চন্ডীপুরে৷ ক্ষ্যাপাবাবা গেলেন কালুকে নিয়ে কালীঘাট দর্শনে৷

হাওড়া থেকে হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরের কাছে পৌছালেন৷ মন্দিরে যাওয়ার আগে শ্মশানঘাটে পাশের আখড়ায় গ্যাঁজা খেয়ে ক্ষ্যাপা আদি গঙ্গায় খুব করে স্নান করে গেলেন মায়ের মন্দিরে৷

মন্দিরে উঠে ক্ষ্যাপা মাকে দেখে তুলে ফেলে দিতে চেয়ে ছিলেন এই বলে “তুই মা এত বিভিষিকা কেন ? — আমার বড়মা কত সুন্দর৷” ওই সময় পুরোহিতরা ক্ষ্যাপাকে নামিয়ে দেয়৷

মন্দির থেকে বেড়িয়ে আসছেন এদিকে রামকৃষ্ণদেবের মন্দিরে ঢুকছেন৷ দুই মহামানবের আলিঙ্গন হয়৷ তখন রামকৃষ্ণেদেব ক্ষ্যাপাকে নিয়ে আদি গঙ্গা দিয়ে নৌকায় চাপিয়ে ক্ষ্যাপাকে নিয়ে গিয়েছিলেন শ্যামনগর ”মূলিজোড় কালী মা ” দর্শন করতে৷

যে মা একসময় গঙ্গায় নৌকায় বেয়ে যাওয়া রামপ্রসাদ সেনের গান শুনতে চেয়েছিলেন৷ রামপ্রসাদ মাকে বলেছিলেন, “তোর যদি গান শুনবার ইচ্ছা হয় তো তুই ঘুরে শোন — আমার আজ কাজ আছে, দাঁড়িয়ে (থেমে) তোকে গান শোনাতে পারব না৷” ভক্তের গান শোনার জন্য মা — মন্দির সমেত দক্ষিন থেকে পশ্চিম দিকে ঘুরে গিয়েছিলেন৷

আজও সেই মন্দির বর্তমান৷ মন্দিরে কৃষ্ণকালী মূর্তি আছে৷ পৌষ মাসে জোড়া মূলা দিয়ে পূজা দিতে হয় সেই জন্য “মূলাজোড় কালী বাড়ী” নামে খ্যাত৷

শ্যামনগরে গঙ্গায় স্নান করে ক্ষ্যাপা ওই রাত্রে নিজে মায়ের পূজা করেছিলেন৷ মাকে দেখে ক্ষ্যাপা পরম শান্তি লাভ করেছিলেন৷

তারপর সেখান থেকে আবার রামকৃষ্ণদেব ও বামাক্ষ্যাপা নৌকায় করে এসে ক্ষ্যাপাকে হাওড়া ষ্টেশনে ছেড়ে যান এবং নৌকায় রামকৃষ্ণদেব দক্ষিণেশ্বরে চলে যান৷

ট্রেনে করে ক্ষ্যাপাবাবা ও কালু কুকুর রামপুরহাটে নেমে উদয়পুরে বটবৃক্ষের তলায় খুবই ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েন৷ সেখানে ক্ষ্যাপার বড়মা — মা তারা বালিকা রূপ ধারন করে ফল, জল খাইয়ে ছিলেন৷ সেখানে বিশ্রাম নিয়ে চন্ডীপুর মহাশ্মশানে ফিরে আসেন৷

চন্ডীপুরে ফিরে ক্ষ্যাপা বড়মাকে কথা দিয়েছিলেন তোকে ছেড়ে আর কোথাও যাব না ”মা”৷ আমি অনেক কষ্ট পেলাম৷ আর আমি কোথাও যাবো না৷ জয় তারা জয় জয় তারা(সংগৃহীত)


সর্বশেষ খবর