সব
ঢাকা Translate Bangla Font Problem

৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস উপলক্ষে চিকিৎসক-রোগীর লেখা

AUTHOR: Amarbangla Desk
POSTED: Sunday 8th September 2019at 12:57 pm
336 Views
বাংলাদেশের প্রথম যৌথ প্রবন্ধ মেরুরজ্জুতে আঘাত-পরবর্তী সফল পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ডা. মনিরুজ্জামান অলিভ, পিটি ও বিভা সিদ্দিকী

 

আমার পেশাগত জীবনের শুরুতে আমি বাংলাদেশের অন্যতম একটি বৃহৎ হাসপাতালে কর্মরত ছিলাম। আজ থেকে প্রায় ৭ বছর পূর্বের একজন রোগীর মেরুরজ্জুতে আঘাত-পরবর্তী পুনর্বাসনে একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক হিসেবে বেশ কিছু স্মৃতি ও রোমাঞ্চ আমাকে এখনও আন্দোলিত করে। একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক হিসেবে কীভাবে একটি সফল পুনর্বাসন এবং কঠিন পথ একজন রোগীর সাথে যৌথভাবে পাড়ি দিয়েছি, তা-ই এই লেখাটিতে বিবৃত করছি।

আমি যাঁর কথা বলছি, তিঁনি আসলে একটি দোতলা দালানের ছাদ থেকে দুর্ঘটনাবশত নিচে পরে গেছিলেন। এতে তাঁর মেরুদন্ডের ৩ টি হাড় বাজেভাবে ভেঙে যায় এবং ঐ অংশ থেকে শরীরের নিচের অংশ অসাড় ও বোধহীন হয়ে যায় । একে মেডিক্যাল পরিভাষায় স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি বা মেরুরজ্জুতে আঘাত বলে।

আমি যখন হাসপাতাল থেকে প্রতিদিনের মতো বেরিয়ে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) থেকে ফোন এলো ফিজিওথেরাপি বিভাগে। একজন রোগীর অপারেশন- পূর্ববর্তী মাংসপেশির শক্তি পরিমাপ করতে হবে আমাকে। আমি তড়িঘড়ি করে সেখানে গেলাম। রোগীর ফাইল দেখে কিছুটা আশাহত হলাম। উপর থেকে পরে মেরুরজ্জুতে আঘাত। কোমর থেকে পায়ের আঙ্গুলে মাংসপেশির ক্ষমতা ছিলো শূন্য এবং বোধ তথা সেনসেশনও ছিলো অনুপস্থিত। আমার খুব খারাপ লাগলো। একে তো আঘাতের ধরন ও শারিরীক প্রকাশন ভালো ছিলো না, এর উপর রোগী ছিলেন বয়সে তরুণ।

কয়েকদিন পর রোগীর সার্জারি হলো; তবে সেটি ছিলো শুধুমাত্র টুকরো হওয়া হাড়ের যথাযথ সম্মিলন ঘটাতে, মূলত রোগীর এমআরআই এর রিপোর্ট ভালোকিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিলো না। কয়েকদিন পর, তিঁনি কেবিনে স্থানান্তরিত হলেন, কাকতালীয়ভাবে আমিই সেখানে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে মনোনীত হলাম। এই প্রথম রোগীর পরিবারকে দেখলাম। অত্যন্ত প্রজ্ঞাময় ও আশাবাদী মনে হয়েছিলো তাঁদেরকে। দুর্ঘটনার পরিণতি যা-ই হোক, একটি রোগীর পেছনে আশার প্রদীপ হাতে একদল মানুষ থাকলে পথ খুঁজে বের করাই যায়। আমার দশ বছরের পেশাগত জীবন থেকে নিয়েই বলছি কথাটি।
যা-ই হোক, এগিয়ে চললো আমাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, রোগী ও তাঁর পরিবারকে নিয়ে আমার যৌথ চিন্তা-নির্ভর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। আমরা হঠাৎ আবিষ্কার করলাম- রোগী তথা মিস বিভার পায়ের একটি আঙ্গুল নড়ছে! আমার চক্ষু তখন ছানাবড়া! মূলত, আমি আজীবন আশাবাদী দলের মানুষ ও পেশাজীবীই মনে করতাম নিজেকে, তবে মিস বিভার সমস্যার তীব্রতা ও ধরনে আমি সন্দিহান ছিলাম। তবে আমার লক্ষ্য ছিলো একাগ্র। আমি জানতাম- কিছু এলে চেষ্টাই হবে,চেষ্টা না করলে
ভালোকিছুও আসবে না। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাটাই এমন!

আমি আমার প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান, কিছুটা অভিজ্ঞতা ও একাগ্রতার শতভাগ দিতে চাইলাম। আমি জানতাম, রোগীটি আমাদের হাসপাতালে ক্ষণিকের অতিথি তবে, তাঁর জীবনের স্বর্ণালি দিনের কোন স্বপ্ন যদি অবশিষ্ট থাকে, তবে তা বিনির্মাণে নিজেকে ক্ষুদ্র অংশীদার করবার সুযোগ রয়েছে, রয়েছে আত্মতুষ্টির তৃপ্তি। কয়েক সপ্তাহ, হাসপাতালে থেকে তাঁর কিছুটা দৃশ্যমান অগ্রগতি ও উন্নতি হলো। কিন্তু ভবিষ্যতের চাকা কতটুকু পথ ঘুরতে পারবে তা নিয়ে কিছুটা চিন্তাও হচ্ছিলো।

হাসপাতাল ছেড়ে বাইরে হাজারো ফিজিওথেরাপিস্ট নামধারী অপেশাদারের দৌরাত্ম্যে তাঁর পুনর্বাসন ক্ষতি হয় কি না, সে শংকায়ও ছিলাম। হাসপাতাল থেকেই মিস বিভার পরিবার তথা তাঁর মা, বাবা ও হাজবেন্ড আমাকে যারপরনাই সহযোগিতা করেছেন। আমি মিস বিভাকে সাহস যুগিয়েছি আর তাঁর ইতিবাচক মানসিকতাসম্পন্ন আধুনিক পরিবার আমাকে এর রসদ জুগিয়েছে।

হাসপাতাল থেকে বিদায় নেয়ার সময় ঘনিয়ে আসতেই তাঁদের মুখে অনিশ্চয়তার ছাপ দেখেছিলাম আমি। মূলত, ঐ সময় মিস বিভার কেবল ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনই দরকার ছিলো, আর এ বিষয়েই তাঁর পরিবার চিন্তিত ছিলেন বেশ। তাঁর কনসাল্টিং নিউরোসার্জন খুব ভালো ছিলেন। একটি সফল অস্ত্রোপচারের পর একটি সুন্দর পরামর্শে তিঁনি হাসপাতাল ছেড়ে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি) তে ভর্তি হয়ে ফিজিওথেরাপি নিতে বলেছিলেন। কিন্তু কিছু অন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের কারনে মিস বিভা ওখানে ভর্তি হতে পারেনি।

এ ঘটনার পরপরই সবার মন খারাপ হয়ে যায়। হঠাৎ আমাকে তাঁর পরিবার রোগীর বাসায় পুনর্বাসন করার জন্য আমাকে অনুরোধ করেন। আমার কাঠামোবদ্ধ চাকুরে-জীবন আর ঢাকার যানজটের সঙ্গে যুদ্ধ করে এটি ছিলো প্রায় অসম্ভব। রোগীর বাসা আমার বাসার কাছাকাছি হওয়ায় এবং অল্পকিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের সাথে সখ্য হওয়ায় আমি এই বিষয়ে আর নেতিবাচক হতে পারিনি। শুরু হলো,তাঁর ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এর সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অধ্যায়, হোম-বেইসড পুনর্বাসন। এটি আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিলো নিঃসন্দেহে। এর দুইটি ভিন্ন কারন ছিলো। প্রথমত- হাসপাতাল/ পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাইরে এধরনের প্রথম অভিজ্ঞতা এবং দ্বিতীয়ত- সমস্যা পরবর্তী রোগীর ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা ভাবনা। আমার মনে আছে, তাঁর বাসা আমরা একটি ছোটখাটো পুনর্বাসনকেন্দ্র করেছিলাম। রোগীর স্বপ্নযাত্রায় সারথী ছিলো তাঁর প্রত্যয়ী পরিবার ও আমি। যখন যেটার কথা বলেছি, যা চেয়েছি- তা পেয়েছি। এরসাথে রোগীর সমস্যা নিয়ে প্রতিদিনই পড়াশুনা করে জেনেছি, তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে জানিয়েছি। আমরা সর্বোচ্চ ভালো উপায় বের করার চেষ্টা করেছি সামগ্রিকভাবে। পুনর্বাসন খাতের সাথে আমার জড়িত থাকার দশ বছরে, আমাকে অবশ্যই বলতে হবে যে এটি আমি এখন পর্যন্ত অংশ নিয়েছি এমন একটি সবচেয়ে ব্যাপক এবং সফল পুনর্বাসন কর্মসূচির মধ্যে একটি ছিলো।

বিভা সিদ্দিকী (রোগী) ডাঃ মনিরুজ্জামান অলিভ, পিটি আমার আঘাতের পর পরিকল্পনা এবং পুনরুদ্ধারের বিষয়ে লিখেছেন, আমি একজন রোগীর হিসাবে
এক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই। সময় চলে যায়, তবে মনে কিছু দাগ থাকে। যদিও দুর্ঘটনার পরে আমার স্মৃতিটি কিছুটা বিস্মৃত হয়ে উঠেছে। আমি ঘটনার সেই দুর্ভাগ্যজনক রাতটি কখনই ভুলবো না। আমার ছাদের কর্নিসে বসে থাকার অভ্যাস ছিলো। যাইহোক, এটি একটি বৃষ্টিস্নাত রাত ছিলো এবং আমি আমার কাছের এক বন্ধুর সাথে ফোনে কথা বলার ছাদের কর্নিসে বসেছিলাম। আমি যখন উঠে পড়ার চেষ্টা করলাম তখন নীচের মেঝের জানালার সানশ্যাডের ছাঁচটিতে পিছলে আমাকে তছনছ করে তৃতীয় তলা থেকে মাটিতে পড়ে গেলাম। আমি তিনতলা বিল্ডিংয়ের পড়ার পরে সম্ভবত কী ঘটতে পারে তা নিয়ে আপনার কল্পনাও ছাড়িয়ে যাবে।
আমার চারপাশের লোকেরা আমাকে সবচেয়ে ভালো সমাধানের জন্য সম্ভাব্য সেরা হাসপাতালে দ্রুত নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যেমনটি আমরা জানি বাংলাদেশে বিশেষত জরুরি বিভাগে উপযুক্ত চিকিৎসা সেবা পাওয়া বেশ জটিল, তাই সমস্ত কিছু মূল্যায়ন করার পরে আমার পরিবার আমাকে দেশসেরা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আমি পুরো পরিস্থিতি জুড়ে সচেতন ছিলাম; কথা বলার এবং
আলোচনার জন্য সবটুকু আমার মনের নেই, তবে যা হয়েছে তা আমার মনে আছে।
আমার মনে আছে জরুরি বিভাগের ডাক্তার যিনি আমার চিবুকের নিচে কাটা সেলাই করেছিলেন। আমাকে আইসিইউতে নেয়া হলো চিকিৎসকেরা এবং নার্সরা এসেছিলেন। কেউ আমাকে যেতে দেওয়ার অনুরোধ শুনেনি। আমি ভাবছিলাম যে আমি পুরোপুরি ঠিক আছি। তাদের কেবল আমাকে যেতে দেওয়া উচিত এবং তারপরে আমি বাড়িতে যেতে পারি। আমি নীচে কোমর থেকে সমস্ত স্নায়ু ফাংশন হারিয়েছি যার অর্থ কোনও সংবেদন বা আন্দোলন ছিলো না। আমার মনে হলো পায়ে একটি ছুরি দিয়ে কাটলেও আমি এটি অনুভব করব না। আমি বুঝলাম আমি শরীরের নিচের সমস্ত অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছি এবং আমার পাগুলোর নড়াচড়া করতে পারছিলাম না।

তারপরে আমাকে অস্ত্রোপচারে নেওয়া হয়েছিলো এবং এতে প্রায় অর্ধেক দিন গেছিলো। নিউরোসার্জন আমার মেরুদণ্ডে একটি ফিক্সেসন রেখেছিলেন। আমি কয়েক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে থাকি। আমি সামগ্রিকভাবে, সেখানে খুব ভালো চিকিৎসা পেয়েছিলাম। যারা আমাকে চেনেন তারা জানেন যে আমি অযথা বসে থাকার কেউ নই। তবে ইনজুরি হওয়ার পর থেকে এ ক্ষেত্রে, আমি নিজের বিছানায়ও ঘুরতে পারিনি। আমার জন্য সব কিছু আমার পরিবারের সদস্যদের করতে হয়েছিলো। বাবা, মা, আমার ছোট ভাই এবং আমার স্বামী আমার ক্রমাগত যত্ন নিয়েছিলেন এবং তারা সমস্ত কর্তব্যকে নিজের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিলেন। আমাদের নিজস্ব একটি সিস্টেম তৈরি হয়েছিলো এবং আমার একমাত্র কাজ ছিলো যত দ্রুত সম্ভব এই লোকদের অবকাশ দেয়াI আমি আমার অস্ত্রোপচারের ৪২ দিন পরে কোনও নির্দিষ্ট মুহুর্তের কথা মনে করি যখন আমাকে অবশেষে দাঁড়াতে দেওয়া হয়েছিল। প্রথমবার আমি ফিজিওথেরাপি বিভাগের একটি কক্ষে দাঁড়াতে যাচ্ছিলাম। ছোট্ট বিষয়গুলি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমি তখন বুঝতে পারি।

বন্ধুবান্ধব, পরিবার এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা সর্বত্র ভালোবাসা এবং আশীর্বাদ পাঠিয়েছিলেন বিদেশ থেকে। স্বজনরা এসেছিলেন কেবল আমাকে দেখতে এবং আমাকে শক্তি দিতে। আমি যাদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার ঘটনা ঘটেনি তারা আমার শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলো; আমি আমার সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষীদের চিনতে সুযোগ পেয়েছিলাম।

একজীবনে কতজন লোক তা পায়? এবং আমি এটি এত তরুণ পেয়েছিলাম। এটি নিশ্চিতভাবেই আমার জীবনকে বদলে ফেলেছে এবং আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে এই সমস্ত কিছুর জন্য আমি কত ভাগ্যবান-একটি প্রেমময় পরিবার, একজন উৎসর্গীকৃত স্বামী, একজন পাগল সহায়ক বন্ধু, দুর্দান্ত চিকিৎসা এবং অবশ্যই একজন নিবেদিত
ফিজিওথেরাপিস্ট। সুতরাং, আপনারা যারা হতাশ বোধ করেন এবং জীবনের শেষ প্রান্তে রয়েছেন বলে মনে করছেন তাঁদের আমি বলব – আপনি কখনই খুব ছোট বা খুব তুচ্ছ নন কারণ মহাবিশ্বও আপনার জন্য একটি পরিকল্পনা করেছে। দেখুন এবং অপেক্ষা করুন! এটি একটি মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতা ছিলো এবং মৃত এবং জীবিতদের সীমানায় মাঝে ছিলাম এবং কেবলমাত্র একটি জীবন ফিরে পেয়েছি যেখানে প্রত্যয়, চেস্টা আর একাগ্রতা নিয়ে আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে এসেছি।

ডা. মনিরুজ্জামান অলিভ, পিটি
বিপিটি (ঢাবি), এমপিএইচ, এমএসএস(ঢাবি)
প্রতিষ্ঠাতা, অলিভ'স ফিজিওথেরাপি- উত্তরা
বিভা সিদ্দিকী
ব্যাচেলর ইন ইকোনোমিক্স, মাস্টার্স ইন ইসিডি
ম্যানেজার, স্কলাস্টিকা এক্সিকিউটিভ অফিস


সর্বশেষ খবর